মহা সংকটে ফিজিওথেরাপী চিকিৎসা

Post Date : 2017-03-15 | Category : medical news

ব্যথা, মাংসপেশির দুর্বলতা এবং বিকলাঙ্গতা চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি এক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে এবং বাত ব্যথার স্থায়ী সমাধান পেতে মানুষ এখন ঝুঁকছে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার প্রতি। ১৯৭২ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন করার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে বর্তমান জাতীয় অর্থোপেডিক এবং পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) কিছু বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী ফিজিওথেরাপিস্ট দিয়ে চালু হয় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা। পরের বছর ১৯৭৩ সালে নিটোরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে চালু হয় দেশের প্রথম ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কোর্স। বর্তমানে নিটোরসহ ঢাকা, রাজশাহী এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৩টি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং ৪টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পেশাগত স্নাতক ফিজিওথেরাপি শিক্ষা ডিগ্রি- বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি কোর্স চালু রয়েছে। স্নাতক ডিগ্রি পাস করতে ১ বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নিশিপসহ ৫ বছরে শিক্ষার্থীদের মোট ৫৩৫০ ঘণ্টার পড়াশোনা করতে হয় এবং ৬২৫০ মার্কসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিআরপিতে এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসএস ইন ফিজিওথেরাপি নামে স্নাতকোত্তর ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি চালু আছে। যেখানে পড়াশোনা করে তারা বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট হতে পারেন। এছাড়া দেশের প্রায় সকল আইএসটিতে ফিজিওথেরাপির উপর ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন হেলথ টেকনোলজি কোর্স চালু আছে। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী এ হেলথ টেকনোলজিস্টরা ফিজিওথেরাপিস্টদের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ডা. ওবাইদুল হক বলেন, ‘বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইসএসসি পাস করার পর প্রতিবছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সারাদেশে ৩৫০ জন মেধাবী শিক্ষার্থী সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি স্নাতক কোর্সে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু ফিজিওথেরাপিস্টদের জন সরকারি চাকরি না থাকায় এসব মেধাবী শিক্ষার্থী পাস করার পর হতাশায় ভুগছে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, একজন ফিজিওথেরাপিস্ট মাংশপেশির কাজের উন্নতি ও পুনরুদ্ধার, চলাফেরার ক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যথা নিরাময়, ইনজুরি এবং অন্যান্য বিকলতা সম্বন্ধীয় শারীরিক সমস্যার প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার জন্য অ্যাসেসমেন্ট (রোগ নির্ণয়) করেন, পরিকল্পনা করেন, ফিজিক্যাল মেথডে চিকিৎসা করেন এবং পুনর্বাসন প্রোগ্রামগুলো প্রয়োগ করেন। ফিজিওথেরাপি একটি স্বতন্ত্র চিকিৎসা পেশা এবং একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ফার্স্ট কন্টাক্ট প্রাকটিশনার। অর্থাৎ, একজন রোগী কোনো প্রকার রেফারেল ছাড়াই সরাসরি ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন। ফিজিওথেরাপিস্ট অ্যাসেসমেন্ট করে যদি ইনফেকশন, ফ্রাকচার, ম্যালিগন্যান্সি বা অন্য কোনো কন্ডিশন যাতে জরুরি ব্যবস্থাপনা, এন্টিবায়োটিক বা সার্জারি প্রয়োজন এমন কিছু পান তাহলে তিনি সেগুলো যথাযথ বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করেন। উন্নত দেশসমূহ যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ফিজিওদের স্বতন্ত্র প্রাকটিস করতেই দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার নমুনা একদম ভিন্ন। সেখানে কোনো ফিজিওথেরাপিস্ট নাই, ফিজিক্যাল মেডিসিনের ডাক্তারা প্রেসক্রিপশনে ইলেকট্রোথেরাপি লিখে দিচ্ছেন আর একজন হেলথ টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) সেগুলো ফিজিওথেরাপির নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিরত সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বলেন, আগে এখানে ফিজিওথেরাপি ডিপার্টমেন্ট ছিলো, ফিজিওথেরাপিস্টরাই স্বাধীনভাবে কাজ করতো। পরবর্তীকালে ডিপার্টমেন্টের নাম পরিবর্তন করে ফিজিক্যাল মেডিসিন করা হয় এবং তখন থেকে ফিজিওথেরাপির নামে রোগীদেরকে ফিজিক্যাল মেডিসিন চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি এ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ডা. শাহদাত হোসেন বলেন, ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর সমস্যা খুঁজে বের করেন, ফিজিক্যাল মেথডে চিকিৎসার পরিকল্পনা করেন এবং নিজেই চিকিৎসা প্রয়োগ করেন। একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দ্বারা কখনো ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সম্ভব না, এটা রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার সামিল। এতে রোগীরা যেমন সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না, তেমনি বদনাম হচ্ছে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার। ফিজিওথেরাপি এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন চিকিৎসার কিছু মিল থাকলেও ফিজিওথেরাপি ফিজিক্যাল মেডিসিনের কোনো অংশ নয়। কেউ কারো অধীনস্ত নয়। ফিজিওথেরাপি ডিপার্টমেন্ট ফিজিক্যাল মেডিসিনের অধীনস্ত কিংবা ফিজিক্যাল মেডিসিন ফিজিওথেরাপি ডিপার্টমেন্টের অধীনস্থ এমন নজির পৃথিবীর কোথাও নাই। তিনি আরে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় ১৮০০ স্নাতক ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছে এবং প্রতিবছর ৩ শতাধিক ফিজিওথেরাপিস্ট পাস করে বের হচ্ছে, জনগণের দোরগোড়ায় সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপজেলা পর্যন্ত ফিজিওথেরাপিস্টদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। ফিজিওথেরাপিস্টদের কোনো কাউন্সিল না থাকায় অনেক ডিগ্রিহীন অসাধু লোক নিজেকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে রোগীদের সাথে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছে।’ দিন দিন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, পারকিন্সনিজম, নিউরোপ্যাথি, মায়েলোপ্যাথি, ফেসিয়াল পালসি, জিবিএস-এর মতন রোগীর সংখ্যা যাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ রোগীদের মধ্যে বিত্তবানরা ঠিকই বেসরকারিভাবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পাচ্ছেন, কিন্তু সরকারি নিয়োগ না থাকায় গরিবরা বঞ্চিত হচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ এ চিকিৎসাসেবা থেকে। শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রতঙ্গে সমস্যা নিয়ে থাকা একজন মানুষকে যেমন সুস্থ বলা যায় না, ঠিক তেমনি ফিজিওথেরাপির মতন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিভাগকে দমিয়ে রেখে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সম্পন্ন বলা যায় না, এমনই মতামত সাধারণ মানুষের।